মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ৮ টাকা ৯৫ পয়সা, যদিও গ্রাহক শ্রেণি ও ব্যবহারের ভিত্তিতে এই হার ভিন্ন হতে পারে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের ‘লাইফলাইন’ গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, মঙ্গলবার (৫ মে) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রস্তাবটি পর্যালোচনার জন্য ইতোমধ্যে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবগুলো বর্তমানে কারিগরি বিশ্লেষণের পর্যায়ে রয়েছে। তবে ঈদুল আজহার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সাধারণত অনুমোদনের পর জুন মাস থেকে নতুন দর কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পাইকারি পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুচরা পর্যায়ের দাম নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে পাইকারি প্রস্তাবের ভিত্তিতেই কারিগরি কমিটি কাজ করছে। ইতোমধ্যে পাঁচটি বিতরণ সংস্থার মধ্যে একটি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবং বাকি সংস্থাগুলোর প্রস্তাবও শিগগির জমা পড়তে পারে।
তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক—যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন—তাদের জন্য দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা।
পিডিবি জানিয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এদিকে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দিয়েছে। পাশাপাশি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিতরণ সংস্থায় সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, সব প্রস্তাব প্রথমে কারিগরি কমিটি যাচাই করবে। এরপর অংশীজনদের অংশগ্রহণে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রস্তাবগুলোর যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিদ্যুৎ খাতের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এবং সরকারের ভর্তুকি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমানে পিডিবি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তিভিত্তিক দামে বিদ্যুৎ কিনে তা নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় ঘাটতি পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না; তারা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা করে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়তে পারে। কারণ বাকি ৬৩ শতাংশ গ্রাহক ‘লাইফলাইন’ শ্রেণিতে পড়ে, যারা ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন।
এ পরিস্থিতিতে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত মূল্য আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।














