দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততার প্রভাব কমাতে সরকার ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর নির্মিতব্য এই মেগা প্রকল্পে স্থাপন করা হবে ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পাশাপাশি ব্যারেজ পরিচালনায় ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজ অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পর্যায়ক্রমে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান যুক্ত হবে এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
পদ্মা নদীর ওপর নির্মিতব্য মূল ব্যারেজটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, একটি ন্যাভিগেশন লক এবং গাইড বাঁধ। এর মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, “এটি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এর মাধ্যমে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষ উপকৃত হবে।”
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মানির্ভর অঞ্চল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং সেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বসবাস।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭০-এর দশকে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গঙ্গা থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়া হয় কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য। এর ফলে বাংলাদেশ অংশে পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যেতে শুরু করে।
এর প্রভাবে কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ, নৌপরিবহন, গৃহস্থালি পানির প্রাপ্যতা এবং সামগ্রিক পরিবেশব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও খালে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বেড়েছে, যা জীবিকা, জীববৈচিত্র্য এবং সুন্দরবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলে টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন জরুরি, কারণ এসব অঞ্চলে পদ্মাই ভূপৃষ্ঠস্থ মিঠাপানির প্রধান উৎস।
সূত্র: বাসস














